ফয়সাল হোসেন (স্টাফ রিপোর্টার) : ঢাকার দক্ষিণের নবাবগঞ্জ উপজেলায় আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে উন্নয়নের অনেক ছোঁয়া লেগেছে । প্রবাসী অধ্যুষিত এই উপজেলায় বর্তমানে মাদক এক ভয়াবহ সমস্যার নাম। বিভিন্ন প্রকার মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে । এখানে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রকার মাদক। প্রতি এক কিলোমিটার রাস্তায় দুই তিনটি করে মাদকের স্পট রয়েছে। মাদকাসক্তের কারণে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পারিবারিক কলহ, খুনের ঘটনা বেড়ে চলছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে সচেতন মহল।
প্রায় প্রতিদিনই নবাবগঞ্জ থানায় বিভিন্ন রকম মাদক দ্রব্যসহ ধরা পড়ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন স্থানে মাদক ব্যবস্যাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ঘটছে মারামারি এমনকি খুনের মতো ঘটনা।
পরিসংখ্যান বলছে মাদক ব্যবস্যাকে কেন্দ্র করে নবাগঞ্জের চেয়ে দোহারে খুনের ঘটনা ঘটেছে বেশি। ২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্তারনগর প্রামে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের কোপে ইয়ারন বেগম নামে এক নারী নিহত হন। আহত হন তার স্বামী মোতা ও নাতনি রিয়া আক্তার। আহত অবস্থায় ইয়ারনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তবরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কারণ হিসেবে নবাবগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়, এ ঘটনার পেছনে রয়েছে মাদক সেবন ও বেচাকেনায় বাধা দেয়া।
এ তো গেল খুনের ঘটনা। এছাড়াও প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে মাদক ব্যবস্যাকে কেন্দ্র করে মারামারি, ইভটিজিং, পারিবারিক কলহের মতো নানা ঘটনা।
মদ, গাঁজা, আফিম, ঝাটকি, ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ নেশার সবধরনের মাদকই পাওয়া যায় এখন দোহার নবাবগঞ্জের বিভিন্ন মাদকের স্পটে। এক সময় ফেনসিডিল, হেরোইনের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে ইয়াবা সেবনের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
গত এক মাসের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নবাগঞ্জে সাধারণত পাওয়া যায় তিন ধরনের ইয়াবা। প্রথম ধরনের ইয়াবা ট্যাবলেটের বেশির ভাগ সবুজ বা গোলাপি রঙের হয়। এর ঘ্রাণ অনেকটা বিস্কুটের মতো হয়ে থাকে। দ্বিতীয় ধরনের ইয়াবা ট্যাবলেটের দাম তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এটিও নেশা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। তৃতীয় ধরনের ট্যাবলেটটি আরও সস্তা এবং নেশায় আসক্তদের কাছে এটি ভেজাল বলে পরিচিত। ইয়াবা সেবনকারীদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা অনুসারে, চিতা নামের পিলটি সবচেয়ে নিম্নমানের ইয়াবা ট্যাবলেট হিসেবে গণ্য হয়। এর গায়ে ক্ষুদ্র চিহ্ন থাকে। অন্যদিকে গোলাপ জল নামের ইয়াবা পিলকে উচ্চমানের ট্যাবলেট হিসেবে গণ্য করা হয়। ইয়াবা ট্যাবলেটের গায়ে ইংরেজি ডাব্লিউ ওয়াই লেখা থাকে। ওয়াই লেখার ধরন দীর্ঘ হলে এবং ইয়াবার রঙ পুরোপুরি গোলাপি হলে ধারণা করা হয় সেটি ইয়াবা হিসেবে ভালোমানের।
নবাবগঞ্জের এক বাসিন্দা পরিচয় গোপন রেখে বলেন, এক সময় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সেবন উচ্চবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা সবার হাতের নাগালে। এ কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত যুবকদের মধ্যেও মাদকের বিস্তার ঘটছে।
নবাবগঞ্জে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, বাংলা মদসহ নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করে আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। মাদকের ছোবল থেকে শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ কেউ বাদ যাচ্ছে না।
নবাবগঞ্জ মাদকে ছড়াছড়ি হলেও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনেকটাই হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। নবাবগঞ্জ উপজেলা সদরের আশপাশের তিনটি গ্রামের শতাধিক যুবক ও ছাত্র মাদকাসক্ত হয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। এর মধ্যে ১০-১৫ জন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।নবাবগঞ্জের পুরুষ অধিবাসীদের শতকরা প্রায় ৮০ জন প্রবাসী। ছেলে-মেয়েদের উঠতি বয়সে বাবার শাসন থেকে তারা মুক্ত। ছেলে-মেয়েরা তাদের সহজ-সরল মাকে স্কুল-কলেজের বেতন কিংবা পোশাক-প্রসাধনী কেনার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নিয়ে নেশাখোর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠছে। ফলে নিজের অজান্তেই মাদকের বিষাক্ত থাবায় নিজেকে সঁপে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানী সূত্রে জানা যায়, এদের মাঝে ভাসমান স্পটের সংখ্যাই দুই শতাধিক। এসব জায়গায় হাত বাড়ালেই ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, বাংলা মদ পাওয়া যায়। জানা গেছে মোটরসাইকেল, রিকশা এমনকি চলন্ত ইজিবাইকে ও মাদকের বেচাকেনা হয়ে থাকে। কিছু স্থানে মাদক ব্যবসার পেছনে জড়িত আছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক কর্মী। যাদের আশ্রয়-প্রশয়ে গড়ে উঠছে মাদকের নিরাপদ আখড়া।
অপরদিকে নবাবগঞ্জ উপজেলার শোল্লা ইউনিয়নের রুপার চর গ্রামকে মাদকের শহর বলা হয়ে থাকে। কাশিয়াখালী বেড়িবাঁধ এলাকা, বারুয়াখালী, নবগ্রাম,আলালপুর,খানেপুর, পুরাতন বান্দুরা, নতুন বান্দুরা, গালিমপুর, চুড়াইন, আগলা, কৈলাইল, বলমন্তচর, আলগীরচর, আজিজপুর, মাদকের কেনা-বেচা অন্যতম স্পট। কারো কারো কছে এসব এলাকা মাদকের হাট নামেও পরিচিতি রয়েছে বলে জানা যায়।এই বিষয়ে স্থানীয়রা বলেন, থানা পুলিশের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের গভীর সম্পর্ক আছে । তারা মোটা অংকের টাকার বিনিময় আসামী ছেড়ে দেয়। এই বিষয়ে নবাবগঞ্জ থানার ডিউটি অফিসারের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখবেন। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড় দেয়া হবে না।